আজকে আমরা খতিয়ানের অংশ অনুযায়ী প্রকৃত জমির পরিমাণ বের করার পদ্ধতি সম্পর্কে জানবো।
খতিয়ানের অংশ অনুযায়ী প্রকৃত জমির পরিমাণ বের করার পদ্ধতি
খতিয়ানের হিস্যা অংশে সর্বশেষ ইউনিট যেটি থাকবে পুরো ষোল আনাকে সে ইউনিটে পরিণত করে তা দিয়ে জমির মোট পরিমাণকে ভাগ করে নিয়ে তারপর প্রত্যেকের অংশ বের করতে হবে। নিচের খতিয়ানে লক্ষ্য করুন। এর সর্বশেষ ইউনিট হচ্ছে “তিল” । অতএব প্রত্যেকের অংশকে তিলে পরিণত করে নেয়া হয়েছে ।
একটি খতিয়ানে জমির হিস্যা বলতে বুঝায় ঐ খতিয়ানে যে কয়জন মালিক আছেন তাদের প্রত্যেকে ঐ খতিয়ানে মোট যে পরিমাণ জমি আছে তার কতটুকু জমির মালিক। ধরি একটি খতিয়ানে ১ জন মালিক- রহিম মিয়া। তাহলে রহিম মিয়া একা ঐ খতিয়ানের সকল জমির মালিক। কিন্তু যদি কোন খতিয়ানে ৪ জন মালিক থাকেন তাহলে প্রত্যেকের নামের পাশে তিনি কত ভাগ জমির মালিক তা লেখা থাকবে। একে জমির হিস্যা বলে।
কোন খতিয়ানের মালিকগণ কে কতটুকু জমির মালিক তা যা দিয়ে বুঝানো হয় তাকে জমির হিস্যা বা অংশ বলে এবং জমির মোট পরিমাণ কে হিস্যা দিয়ে গুণ করে কোন মালিকের জমির পরিমাণ জানা যায়।
খতিয়ান
মোট ১১ জন
হিস্যা মোট ১৩১২ শতাংশ
ব্যাখ্যা :
১৬ আনা = ৭৬৮০০ তিল।
এবার জমির মোট পরিমাণকে ৭৬৮০০ দ্বারা ভাগ করা হয়েছে।
(১৩১২ / ৭৬৮০০) = .০১৭০৮৩৩
এবার প্রত্যেকের অংশানুযায়ী যত তিল হয়েছে তা দিয়ে গুণ করলেই প্রকৃত পরিমাণ বের করা যাবে।
√৫।।//১২ = দুই আনা ৫গণ্ডা ২ কড়া ২ ক্রান্তি ১২ তিল ।
খতিয়ানে ভগ্নাংশ প্রযোজ্য নয় বিধায় কাউকে ১ তিল করে বাড়িয়ে দিয়ে খতিয়ান তৈরী করা হয় (উপরোক্ত নিয়মে)। তবে এর অর্থ কাউকে জমি কম বা বেশী দেয়া নয়।
ইলেক এর ব্যবহার :
।/৫ ।।//১৩ তিল= ৫ আনা ৫ গণ্ডা ২ কড়া ২ ক্রান্তি ১৩ তিল ।
।/৬।। = ৫ আনা ৬ গণ্ডা ২ কড়া
।/১ = ৫ আনা ১ গণ্ডা
(১ = ১ গণ্ডা
।।= ২ কড়া
।।// = ২ কড়া ২ ক্রান্তি
১৩ = ১৩ গণ্ডা
উপরে একটি ব্যাপার লক্ষ করুন। প্রথমে আনা তারপর ক্রমান্বয়ে গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিল এভাবে সাজানো হয়েছে। কিন্তু এ ক্রমের ব্যত্যয় ঘটলেই (ইলেক চিহ্ন) ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সিরিয়াল ঠিক থাকলে ইলেক চিহ্ন ব্যবহার করার দরকার নেই। কিন্তু প্রথম দিক থেকে সিরিয়াল ঠিক না থাকলে ইলেক চিহ্ন ব্যবহার করতে হয় ।
উদাহরণ :
ক্রমিক
মালিক
অংশ
দাম
দাগের মধ্যে খতিয়ানের অংশ
শতাংশ
১
কালাম
.৫০
২৩০
১.০০
২০
২
সালাম
.১৮৭
২৩১
১.০০
২৫
৩
জামাল
.৩১
২৩২
১.০০
১৮
৪২০
.৫০
১৬
৪৩০
.৭৫
৭
৩ জন ১.০০ ৫ দাগ ৮৬ শতক
এখানে কালামের হিস্যা ৮ আনা, অর্থাৎ সমস্ত সম্পত্তিকে ১ ধরলে ৫০ অংশ হয়। সালামের হিস্যা ৩ আনা মানে এক টাকার ১৮৭ অংশ, জামালের হিস্যা ৫ আনা যা এক টাকার হিসাবে ৩১ পয়সা হয়।
এবার মোট জমির পরিমাণ হলো ৮৬ শতক। এই ৮৬ শতককে ২ দিয়ে অংশ দ্বারা গুণ ভাগ করে {(৮৬ + ১) = ৮৬} তাকে তাদের অংশ দ্বারা গুণ করলে প্রত্যেকের জমির পরিমাণ পাওয়া যাবে।
কালাম পাবে = ৮৬ x .৫০ = ৪৩ শতক
সালাম পাবে = ৮৬X.১৮৭ = ১৬ শতক
জামাল পাবে = ৮৬ × .৩১ = ২৭ শতক
মোট = ৮৬ শতক
ভিন্ন নিয়মে :
(৮৬ / ১৬ আনা) = ৫.৩৭৫
কালাম = ৫.৩৭৫ × ৮ = ৪৩ শতক
সালাম = ৫.৩৭৫ x ৩ = ১৬.১২৫ শতক
জামাল = ৫.৩৭৫ × ৫ = ২৬.৮৭৫ শতক
মোট = ৮৬ শতক
বিঃ দ্রঃ এখানে একক / শতকের ঘরটি লক্ষ্যণীয় ২০, ২৫, ১৮ এগুলো ১৬ আনা বলে সরাসরি ১৬ আনা বা সম্পূর্ণ বসে গেছে। কিন্তু ৪২০ নং দাগে ৮ আনা বিধায় ৩২ এর স্থলে তার অর্ধেক অর্থাৎ ১০ শতক বসেছে এবং ৪৩০ নং দাগের ৯ শতকের ১২ আনা হয় ৭ শতক ।
আজকে আমরা আলোচনা করবো বিভিন্ন খতিয়ান দেখে এর হিস্যা বা অংশ বন্টন পদ্ধতি সম্পর্কে
বিভিন্ন খতিয়ান দেখে এর হিস্যা বা অংশ বন্টন পদ্ধতি
খতিয়ান হচ্ছে একটি হিসাবনিকাশের পাকা বইতে প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় লেনদেনগুলোর বিভন্ন প্রকার পক্ষসমূহকে পৃথক পৃথক শিরোনামের আওতায় শ্রেনীবদ্ধভাবে এবং সংক্ষিপ্তকারে লিপিবদ্ধ করা। এক কথায় খতিয়ান হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের সকল হিসাবের সমষ্টিগত রুপ।
খতিয়ানের অর্থ হইল “হিসাব”।সাধারণভাবে স্বত্ব সংরক্ষণ ও রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে জরীপ বিভাগ কর্তৃক প্রত্যেক মৌজার ভূমির মালিক বা মালিকগণের নাম, পিতা অথবা স্বামীর নাম, ঠিকানা, হিস্যা(অংশ) এবং তাদের স্বত্বাধীন দাগসমূহের নম্বরসহ বূমির পরিমাণ, ম্রেণী, এদের জন্য দেয় খাজনা ইত্যাদি বিবরণ সহ ক্রমিক সংখ্যা অনুসারে যে স্বত্ব তালিকা বা স্বত্বের রেকর্ড প্রস্তুত করা হয় তাদের প্রত্যেকটিকে খতিয়ান বলা হয় এবং উক্ত রেকর্ডকে স্বত্ত্বের রেকর্ড বা রেকর্ড অব রাইটস(ROR)বলা হয়।
এব বা একাধিক দাগের সম্পূর্ণ বা আংশিক পরিমাণ ভূমি নিয়ে এক বা একাধিক ব্যক্তির নামে স্মরনীয় বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যে ভূমি স্বত্ব প্রস্তুত করা হয় তাকে “খতিয়ান” বলে।
খতিয়ানগুলো ১,২,৩,৪,৫ ইত্যাদি ক্রমিক সংখ্যা দ্বারা সাজানো হয়ে থাকে। প্রত্যেক খতিয়ানে একটি সংখ্যা রয়েছে। ইহাদেরকে খতিয়ান নম্বর বলা হয়। প্রত্যেক মৌজার খতিয়ান ১(এক) হতে শুরু হয়। কোন কোন মৌজার কয়েক হাজারের বেশি থাকতে পারে। কোন মৌজার কতটি খতিয়ান রয়েছে তা উক্ত স্বত্বের রেকর্ড (ROR) পাওয়া যায়।
বিভিন্ন খতিয়ান দেখে অংশ বন্টন পদ্ধতি
বিভিন্ন খতিয়ানের মালিক বা রায়তের নামের পাশে তার হিস্যাংশ দেয়া থাকে। এখানে মোট জমির মধ্যে তার হিস্যা কতটুকু তা বুঝায়। নিচে হিস্যাংশের হিসাব বের করার পদ্ধতি দেয়া হলো :
ক্রমিক
মালিকের নাম
সাবেক হিস্যা
বর্তমান হিস্যা
১
রহিম মিয়া
।/৬।।//
.৩৩৩
২
ধলা মিয়া
।/৬।।//
.৩৩৩
৩
করিম মিয়া
।/৬।।//
.৩৩৩
1/৬।///; = ৫ আনা ৬ গন্ডা ২ কড়া ২ক্রান্তি
১ = ১ (সম্পূর্ণ) বা ১৬ আনা ৷
তৎকালে ৬৪ পয়সায় ১ টাকা ধরা হতো। বর্তমানে ১০০ পয়সায় ১ টাকা ধরা হয় ।
বাংলাদেশে বসবাসরত বৌদ্ধরা উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে হিন্দু দায়ভাগ আইন দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে, যদিও ১৯৫৬ সালে ভারতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এ বৌদ্ধদের উত্তরাধিকারের বিষয়টি ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন এবং হিন্দু দায়ভাগ আইনের সমন্বয়ে স্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে অদ্যবধি উক্তরূপ কোন সংশোধনী গৃহীত হয়নি। এখানকার বৌদ্ধরা পুরোপুরিভাবে হিন্দু দায়ভাগ আইন দ্বারা উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে শাসিত হয়।
বৌদ্ধদের জন্য যেমন পৃথক উত্তরাধিকার আইন বিদ্যমান নেই, তেমনি তাদের উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিরোধ নিয়ে উচ্চাদালতের খুব বেশী নজির বা সিদ্ধান্ত পরিলক্ষিত হয় না ( 32 DLR 187 40 DLR 137 (AD) নজিরদ্বয় বৌদ্ধদের উত্তরাধিকার সম্পর্কিত ধারণাকে স্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত করেছে।
বাংলাদেশের মারুয়া বৌদ্ধরা ছাড়া এদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার দায়ভাগ হিন্দু আইনের আওতাভুক্ত। ব্রহ্মদেশীয় বৌদ্ধরা এবং বাংলার মারুয়া বৌদ্ধরা যথাক্রমে ব্রহ্মদেশীয় বৌদ্ধ আইন এবং মারুয়া বৌদ্ধ আইন দ্বারা শাসিত। বাংলাদেশের মারুয়া বৌদ্ধরা ভারতীয় উত্তরাধিকার আইনে (১৯২৫ সনের ৩৯নং আইন) শাসিত তবে এটি সর্বজনবিদিত যে ব্রহ্মদেশীয় বৌদ্ধরা যেমন স্থানীয় অর্থাৎ ব্রহ্মদেশীয় উত্তরাধিকার আইন গ্রহণ করেছেন; তেমনই ভারতীয় বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার ভারতীয় হিন্দু আইনের আওতাভুক্ত।
বলা বাহুল্য বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্ম সনাতন ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও সনাতন ধর্মের অঙ্গ, এ সনাতন ধর্ম মুনি-ঋষিদের সংকলিত শ্রুতি শাস্ত্রাদির আইনের অনুশাসনে প্রচলিত। গৌতমবুদ্ধ শাক্যমুনি হিসেবে অভিহিত। শাক্যমুনি তার অনুসারীদের জন্য ইসলাম ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম ও অন্যান্য ধর্মের ন্যায় উত্তরাধিকার আইনের ভিন্ন নির্দেশ দেননি।
মানব জাতির কল্যাণের জন্য তিনি যে ধর্মের সংস্কার করেছেন, যা ধারণ ও পালন করবে জাগতিক দুঃখ-কষ্ট দূর হবে এবং পারলৌকিক নির্বাণ অর্থাৎ মুক্তিলাভ হবে। ভারত থেকে চলে যাওয়া ব্রহ্মদেশীয় বৌদ্ধরা তাদের ধর্মগুরু অর্থাৎ বৌদ্ধ ভিক্ষুর নিকট তাদের উত্তরাধিকার ও অন্যান্য বিষয়ে আইন প্রণয়নের জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন করলে বৌদ্ধ ভিক্ষু জানান যে, তারা ভিক্ষু অর্থাৎ সন্ন্যাসী বিধায় দেশচার, আইন-কানুনে লিপ্ত থাকতে পারেন না।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ন্যায় হিন্দু সন্ন্যাসীরাও নিজ নিজ ধর্মীয় নীতি ছাড়া অন্য কোন দেশীয় প্রচলিত আইনের অনুশাসনে শাসিত নন। দেশের তৈরি আইনে দেশের জনসাধারণের মানব সমাজে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে চলা এবং ন্যায়নীতির মাধ্যমে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
বৌদ্ধ উত্তরাধিকার আইন
বৌদ্ধ ধর্মের সাথে সনাতন ধর্মের মৌলনীতির পার্থক্যঃ
হিন্দু সম্প্রদায় সনাতনপন্থী। স্মৃতিশাস্ত্রের প্রচলিত নীতি অনুসারে হিন্দুদের আচার, বিচার ও সামাজিক অনুষ্ঠানানির প্রথা আর্য সভ্যতা থেকে চিরাচরিতভাবে চলে আসছে। মাঝে মাঝে কোন স্থানীয় প্রথা সমাজের স্থানীয় সঙ্গতি বজায় রাখার জন্য শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের পরামর্শ নিয়ে কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং হিন্দু আইনের সংস্কার সাধন ঘটেছে।
তাই দেখা যায়, হিন্দু সমাজে গোষ্ঠী ও স্থানীয় পরিবেশে কিছু কিছু গড়মিল। তেমনি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে এক শ্রেণীর সাথে অন্য শ্রেণীর আচার, বিচার ও সামাজিক অনুষ্ঠান এক নয়। সুতরাং, উপমহাদেশে সনাতনপন্থী হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নিজ নিজ প্রথা বাতীত ধর্মের মৌলনীতি পৃথক নয় ।
ডি এফ মোল্লার Principles of Hindu Law এর Operation of Hindu Law এর অনুচ্ছেদে Persons governed by Hindu Law তে বলা হয়েছে- “Hindu Law applies (iv) to Jaina Buddhists in India. Sikhs except so far as such law is veried by custom.” অর্থাৎ জৈন ভারতের বৌদ্ধ ও শিখ সম্প্রদায় অবশ্য তাদের নিজস্ব প্রথাসম্মত আইন ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে হিন্দু আইনের আওতাভুক্ত।
বৌদ্ধ উত্তরাধিকার আইন
ভারতীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের অন্তর্ভুক্তঃ
ভারতবর্ষের সুপ্রীম কোর্টের বিভিন্ন কেসের ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের ১৯৫৬ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার সংশোধিত আইনের ২ ধারার (১) উপ-ধারায় বর্ণিত আছে।
This act applies-
a) to any person
b) to any person who is a Buddhist Jaina or Sikh by religion, and
c) to any other person.
Explanation-
The following persons are Hindus,Buddhists, Jainas or Sikhs by religion, as the case my be:
a) any child legitimate or illigitimate both of whose parents are Hindus, Buddhists, Jainas or Sikhs by religion.
b) any child lagitimate or illigitimate. one of whose parents is a Hindu, Buddhist. Jaina or Sikh by religion and who is brought up as a member of the tribe community group of family to which such parent belongs of belonged:
c) any person who is convert or reconvert to the Hindu,Buddhist, Jaina or Sikh religion.
অতএব উপরোল্লিখিত তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় ভারতীয় হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে শাসিত ও আওতাভুক্ত। কিন্তু যে সব বৌদ্ধ ভারত ত্যাগ করে ব্রহ্মদেশে চলে গিয়েছে এবং তথায় বসবাস করে তথাকার অধিবাসী হয়েছেন, তারা ভারতীয় সমাজ হতে পৃথক হয়ে স্থানীয় উত্তরাধিকার আইনে শাসিত। বাংলাদেশে বসবাসকারী বৌদ্ধ সম্প্রদায় হিন্দু দায়ভাগ আইনের আওতায় উত্তরাধিকার পেয়ে থাকে।
বৌদ্ধদের জন্য এখানে পৃথক কোন উত্তরাধিকার আইনের প্রবর্তন ও প্রচলন না থাকলেও ন্যায়নীতির ওয়ার তুলে ইচ্ছামাফিক উত্তরাধিকার নির্ণয় করা যাবে না। সে কারণে হিন্দু দায়ভাগ আইনের আওতায় বাংলাদেশের বসবাসকারী বৌদ্ধদের উত্তরাধিকারের প্রশ্ন মীমাংসা করতে হবে।
ব্রহ্মদেশের বৌদ্ধরা Burman Buddhist নামে পরিচিত। তাদের উত্তরাধিকার আইনের ক্রম নিম্নরূপঃ
(বিশুধানন্দ মৃত ব্যক্তি)
১- পুত্রসন্তান
২য়- পৌরা
৩য়-প্রপৌত্র
৪র্থ-দত্তক পুত্র
৫ম-সৎ মাতার পুত্র
৬ষ্ঠ-অবৈধ সন্তান ও অবৈধ সৎপত্নীর সস্তান
৭ম-ভ্রাতা ও ভগ্নি
৮ম-পিতামাতা
৯ম-পিতার পিতামাতা
১০ম- দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়
১০ (ক) ভ্রাতুষ্পুত্র ও পুত্রী
১০ (খ) খুড়া ও খুড়ি
১০ (গ) ভ্রাতুষ্পুত্র ও পুত্রীর সন্তানগণ
১০ (ঘ) কাজিন
১০(ঙ)-ভ্রাতুষ্পুত্রের ও পুত্রীর পৌত্র ও পৌত্রীগণ
১০(চ)-কাজিনের সন্তানগণ
১০ (ছ) কাজিনের পৌত্র সন্তানগণ
১০ (জ)-কাজিনের প্রপৌত্র সন্তানগণ ।
Burmese Buddhist দের উপরোল্লিখিত উত্তরাধিকার আইনের ক্রম হতে পরিজ্ঞাত হওয়া যায় যে হিন্দু উত্তরাধিকারের ক্রমের সাথে তার তেমন তথ্যগত পার্থক্য নেই। ব্রহ্মদেশীয় বৌদ্ধরা দত্তকপুত্র গ্রহণে হিন্দু আইনে দত্তকচন্দ্রিকা নীতি অনুসরণ করেন।
আজকের আলচনার বিষয় খ্রিস্টান উত্তরাধিকার আইন। “ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫ এর ২৪-৪৯ ধারার বিধানসমূহ খ্রিস্টান উত্তরাধিকার আইন হিসেবে অভিহিত যা পি. ও. ৪৮/৭২ মূলে বাংলাদেশে বলবৎ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট উভয় শ্রেণীর খ্রিস্টানদেরই আইনের উল্লিখিত ধারাসমূহ প্রযোজ্য হয়েছে।
খ্রিস্টান উত্তরাধিকার আইন
খ্রিস্টান উত্তরাধিকার দু’প্রকার :
(১) সগোত্র এবং (২) সমগোত্র
সগোত্রঃ
একজন পুরুষ যে সম্পর্কের দ্বারা অন্যজনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত (একজন হতে অন্যজন জাত) হয় সে সম্পর্ককে বলে সগোত্র। কোন ব্যক্তির উর্ধ্বগামী সগোত্র হল তার পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ নিম্নগামী সগোত্র হল পুত্র পৌত্র, প্রপৌত্র।
সমগোত্রঃ
একই পূর্বপুরুষ হতে আগত কিন্তু একজন অন্যজন হতে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত না হলে তাকে বলে সমগোত্র। যেমন- ভাই, চাচা, চাচাত ভাই ইত্যাদি ।
খ্রিস্টান উত্তরাধিকার আইন
সম্পর্কের ডিগ্রীঃ
খ্রিস্টান আইনে উত্তরাধিকার নির্ণয়ের ভিত্তি হলো ডিগ্রী। এ ডিগ্রী দ্বারা সম্পর্কের দূরত্ব নির্ণয় করা হয়। এ ডিগ্রীর মান যত বেশি হবে উত্তরাধিকারের অগ্রাধিকার তত কম হবে। যেমন-
মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পিতা-পুত্র = এক ডিগ্রী
মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পিতা-ভাই = দুই ডিগ্রী
মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক চাচা-ভ্রাতুষ্পুত্র = তিন ডিগ্রী
মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক চাচাত ভাই-চাচাত ভাই = চার ডিগ্রী ।
খ্রিস্টান উত্তরাধিকার আইন
খ্রিস্টান উত্তরাধিকার আইনে সম্পদ বণ্টনের নীতি:
(১) সমপর্যায়ের নারী, পুরুষের সমান অংশ পাবে।
(২) সরাসরি নিম্নবর্তী ওয়ারিশ থাকলে উবর্তী কেউ সম্পদ পাবে না।
(৩) সম্পদ বণ্টনে স্বামী/স্ত্রী অগ্রাধিকার পাবে।
(৪) সরাসরি নিম্নবর্তী সন্তান থাকলে স্বামী/স্ত্রী ১/৩ অংশ পাবে, নিম্নবর্তী না থাকলে ১/২ অংশ পাবে।
নিম্নবর্তী/উর্ধ্ববর্তী আত্মীয় না থাকলে স্বামী/স্ত্রী সম্পূর্ণ অংশ পাবে।
(৫) স্বামী/স্ত্রী বা সগোত্রের কেউ না থাকলে সমগোত্রের আত্মীয় সম্পত্তি পাবে।
(৬) মৃতের স্বামী/স্ত্রী, সমগোত্রীয় কেউই না থাকলে তার সম্পত্তি সরকার বরাবরে বাজেয়াপ্ত হবে।
(৭) স্বামী/স্ত্রীকে দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি সন্তান সমান ভাগে পাবে ।
(৮) মৃতের সন্তান জীবিত না থেকে থাকলে এবং সন্তানের সস্তান বেঁচে থেকে থাকলে তারা প্রত্যেকে সমান অংশ পাবে।
(৯) মৃত ব্যক্তির সন্তান না থাকলে স্বামী বা স্ত্রীকে দেওয়ার পর বাকি সম্পত্তি মৃতের পিতা পাবে। এক্ষেত্রে পিতাও জীবিত না থাকলে মাতা এবং ভাই বোন সমান অংশে সম্পদ পাবে।
(১০) ভাই বোন বেঁচে না থাকলে তাদের সন্তানগণ অংশ পাবে।
(১১) পিতা, ভাই-বোন বা ভাই-বোনের সন্তানও না থাকলে মাতা সম্পূর্ণ অংশ পাবে। অনুরূপভাবে কেবল পিতা থাকলে সেই সম্পূর্ণ অংশ পাবে ।
(১২) ধর্মান্তরের জন্য উত্তরাধিকত্ব থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না ।
(১৩) অবৈধ সন্তান উত্তরাধিকারিত্ব থেকে বঞ্চিত হবে।
(১৪) জীবিত ও গর্ভস্থ সন্তান সমান অংশ পাবে।
(১৫) সৎ মাতার সাথে মৃতের রক্ত সম্পর্ক না থাকায় সে অংশ পাবে না।
(১৬) দত্তক সন্তান দত্তকি পিতার সম্পত্তির ওয়ারিশ হবে না।
(১৭) কোন হিন্দু ব্যক্তি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলে তার সম্পত্তি খ্রিস্টান উত্তরাধিকারী আইন অনুযায়ী বণ্টিত হবে।
খ্রিস্টান উত্তরাধিকারের কতিপয় উদাহরণ:
১। ওয়ারিশ = স্ত্রী + পুত্র/কন্যা
= (১/৩) + (২/৩)
২। ওয়ারিশ = স্ত্রী + পুত্র + কন্যা
= (১/৩) + (১/৩) + (১/৩)
৩। ওয়ারিশ = স্বামী + পিতা
= (১/২) + (১/২)
৪। ওয়ারিশ = স্ত্রী+ভাই+বোন
= (১/২) + (১/৪) + (১/৪)
৫। ওয়ারিশ = স্ত্রী + মাতা + ভাই + বৈপিত্রেয় বোন/বোন
= (১/২) + (১/৪) + (১/৮) + (১/৮)
৬। ওয়ারিশ = স্ত্রী + মাতা + ভাই + বোন + ভাইয়ের ছেলে
= (১/২) + (১/৪) + (১/১২) + (১/১২) + (১/১২)
মৃত ব্যক্তি = স্ত্রী + পুত্র + পিতা + পুত্র (মৃত) + কন্যা + কন্যা (মৃত)
হিন্দু আইন হিন্দুদের ব্যক্তিগত ও সনাতনী ধর্ম। এ আইনের মৌলিক ভিত্তি হল বেদ। উত্তরাধিকার, বিবাহ, অভিভাবকত্ব, উইল, বণ্টন, দান ইত্যাদি এ আইন দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। হিন্দু আইনের উৎস চারটি (১) বেন বা শ্রুতি (২) স্মৃতি (৩) ব্যাখ্যা বা নিবন্ধ (৪) প্রথা। এছাড়া হিন্দু আইনের তিনটি আধুনিক উৎস রয়েছে। যথা (১) আদালতের সিদ্ধান্ত বা নজির (২) বিধিবদ্ধ আইন (৩) সুবিচার / ন্যায়পরায়ণতা।
উত্তরাধিকার
হিন্দু আইনে দু’প্রকার উত্তরাধিকার পদ্ধতি চালু আছে (১) মিতাক্ষরা (২) দায়ভাগ পদ্ধতি। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুগণ দায়ভাগ মতবাদের অনুসারী। অন্যান্য অঞ্চলের হিন্দুগণ মিতাক্ষরা মতবাদের অনুসারী। তাই এখানে শুধু দায়ভাগ মতবাদ নিয়েই আলোচনা করা হল :
দায়ভাগঃ
দায়ভাগ অনুসারে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির অধিকার তার ওয়ারিশগণ উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত হয়। পিণ্ড দানই হচ্ছে উত্তরাধিকার নির্ণয়ের ভিত্তি। দায়ভাগ মতে হিন্দু উত্তরাধিকার তিন প্রকার (১) সপিণ্ড (২) সকূল্য ও (৩) সমানোদক।
সপিন্ডঃ
দায়ভাগ মতে সপিণ্ড হলো সবচেয়ে নিকটবর্তী উত্তরাধিকারী। যে সব ব্যক্তি সপিন্ড শ্রেণীভুক্ত তারা হলঃ
(ক) পিতৃকূলে ঊর্ধ্বতন ও পুরুষ ও মাতৃকূলে উর্দ্ধাতন ৩ পুরুষ = ৬ জন ।
(খ) পুত্রের দিকের নিম্নবর্তী ও পুরুষ ও দৌহিত্র জাতীয়দের নিম্নবর্তী ও পুরুষ = ৬
(গ) উল্লিখিত ১২ জন ছাড়াও পিণ্ড দানের অধিকারী আরও আছে ৩৬ জন।
(ঘ) এ ছাড়াও বিশেষ নিয়মে বিধবা, কন্যা, মাতা, পিতামহী ও প্রপিতামহী এ ৫ জন মহিলাসহ ৫৩ জন ।
হিন্দু উত্তরাধিকার আইন
সকূলঃ
এরা সপিণ্ডের পরবর্তী সারির উত্তরাধিকারী। এরা হলো প্রপিতামহের উর্দ্ধতন পুরুষ। সপিদের অবর্তমানে এরা উত্তরাধিকারী হয়।
সমানোদকঃ
এরা তৃতীয় শ্রেণীর ও দূরবর্তী উত্তরাধিকারী। সকূল্যের ঊর্ধ্বতন সাত পুরুষ সমানোদক হিসাবে অভিহিত। এরা সকলেই পুরুষ এদের সংখ্যা ১৪৭ জন । বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে সপিগুদের কেউ বেঁচে থাকলে সকূল্য ও সমানোদকদের কেউ সম্পত্তি পাবে না। এরূপেই এ তিন শ্রেণীর উত্তরাধিকারীদের অধিকার ক্রমান্বয়ে আসবে।
সম্পত্তি হতে বঞ্চিতঃ
যে সব কারণে একজন হিন্দু উত্তরাধিকত্ব হতে বঞ্চিত হয়।
(ক) অসতী হলে,
(খ) ধর্মান্তরিত (কেবল বাংলাদেশে প্রযোজ্য); ভারতে “ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন, ১৮৫০” The Caste Disabilities Act (Act XXI of 1850) মূলে ধর্মান্তরের জন্য সম্পত্তি হতে কেউ বঞ্চিত হয় না,
(গ) শারীরিক ও মানসিক অসমর্থতা (মিতাক্ষরা অনুসারীদের মধ্যে),
(ঘ) সহজাত পাগল ও হাবা ছাড়া অন্য অসমর্থরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে না,
(ঙ) হত্যাকারীঃ হত্যাকারী নিজে বা কারো মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটালে হত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে সে বঞ্চিত হবে,
(চ) পাপাসক্ততাঃ পাপাসক্ত ব্যক্তি বঞ্চিত হবে, তবে প্রায়শ্চিত্তের পর সম্পত্তি পাবে,
(ছ) সন্ন্যাসীঃ কোন হিন্দু সন্ন্যাসী হলে তাকে মৃত গণ্য করা হয় এবং তিনি সম্পত্তি পান না। যে সকল অযোগ্যতার জন্য কোন হিন্দু সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন ঐ সকল যোগ্যতার অবসান সম্পত্তি বন্টনকালে হলে তিনি সম্পত্তি পাবেন।
স্ত্রী ধনঃ
স্ত্রী ধন অর্থ নারীর সম্পদ। মহামুণি মজুর মতে বিবাহযজ্ঞের পূর্বে কণেকে যা দেয়া হয় (বিবাহের সময়) তাই স্ত্রী ধন। দায়ভাগ আইনের রচয়িতা জীমুতিবাহন এর মতে ‘স্ত্রী ধন হলো নারীর একান্ত নিজস্ব সম্পত্তি, যাতে তার স্বামীরও কোন কর্তৃত্ব নেই।
হিন্দু উত্তরাধিকার আইন
স্ত্রী ধনের উত্তরাধিকারঃ
(ক) অবিবাহিতা কন্যা স্ত্রী ধন রেখে মারা গেলে তার উত্তরাধিকার হবে
(১) সহোদর ভাই (২) মাত্রা (৩) পিতা (৪) পিতার নিকটতম উত্তরাধিকারী।
(খ) কোন বিবাহিতা মহিলা স্ত্রী ধন রেখে মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি চার ভাগে বিভক্ত হয়। যথা—
১। শুল্কঃ
(স্বামী গৃহে যাওয়ার সময় যে উপহার দেয়া হয়েছিল) এর উত্তরাধিকারী (ক) সহোদর ভাই (খ) মাতা (গ) পিতা (ঘ) স্বামী ।
২। যৌতুকঃ
(আত্মীয়স্বজন কর্তৃক বিবাহের সময় দেয় উপহার) এর উত্তরাধিকারী হবেন।
(ক) কুমারী কন্যা (খ) বাগদত্তা কন্যা (গ) পুত্রবর্তী বিবাহিতা কন্যা (ঘ) বিবাহিতা বন্ধ্যা/বিধকা কন্যা (3) পুত্র (চ) কন্যার পুত্র (ছ) পুত্রের পুত্র (জ) পুত্রের পৌত্র (ঝ) সৎপুত্র (এ) সৎ পুত্রের পুত্র (ট) সংপুরের পৌত্রা।
৩। অনুধেয়কঃ
(বিবাহকালে পিতার নিকট হতে প্রাপ্ত উপহার) এ ধরনের সম্পদ ‘যৌতুক’ স্ত্রী ধনের ন্যায় বণ্টিত হবে, তবে পুরুষগণ বিবাহিতা কন্যার পূর্বে পাৰে।
৪। অযৌতুকঃ
(বিবাহের পূর্বে বা পরে প্রাপ্ত যাবতীয় সম্পত্তি) এর উত্তরাধিকারী হবেন।
(ক) পুত্র এবং কুমারী কন্যা (সমান) (খ) পুত্রবর্তী কন্যা (গ) পৌত্র (ঘ) দৌহিত্র (ঙ) বিবাহিতা বন্ধ্যা/বিধবা কন্যা (চ) সহোদর ভাই (ছ) মাতা (জ) পিতা এবং (ঝ) স্বামী।
হিন্দু উত্তরাধিকার আইন
উত্তরাধিকার এর হিস্যা বণ্টন পদ্ধতিঃ
(১) পুত্র পিতার সমগ্র সম্পত্তির একক উত্তরাধিকারী
(২) পুত্র একাধিক হলে সমান হারে সম্পত্তি পাবে।
(৩) পুত্র মারা গিয়ে থাকলে পৌত্র উত্তরাধিকারী হবে (পিতার অংশ পাবে)।
(৪) বিধবা স্ত্রী এক পুত্রের সমান অংশ ‘জীবন স্বত্ব পাবে। (সম্পত্তিতে হিন্দু নারীদের অধিকার আইনের ৩(১) ধারা)।
(৫) একাধিক বিধবা স্ত্রী থাকলে সকলে একত্রে এক পুত্রের সমান সম্পত্তি পাবে।
(৬) মৃতের বিধবা পুত্রবধূ/প্রপৌত্রবধূ থাকলে সে এক পুত্রের সমান ‘জীবন স্বত্ত্ব’ পাবে (কৃষি জমি ব্যতীত)।
(৭) উপরে বর্ণিত ১-৬ নং ক্রমিকের কোন উত্তরাধিকারী না থাকলে কন্যা পিতার সম্পত্তি পাবে।
(৮) কন্যাদের মধ্যে ‘কুমারী কন্যার’ দাবি প্রথম এবং সে-ই সব সম্পত্তি পাবে।
(৯) কুমারী কন্যা না থাকলে পুত্রবর্তী কন্যা উত্তরাধিকারী হবে।
(১০) বন্ধ্যাকন্যা, বিধবা কন্যা, সন্তানহীন কন্যা এবং যে সব কন্যার শুধু কন্যা সন্তান আছে তারা উত্তরাধিকারী হবে না। তবে এরূপ কন্যাদের মধ্যে যে, কোন দত্তকপুত্র গ্রহণ করেছে সে বঞ্চিত হবে না।
(১১) এরপর ক্রমানুসারে উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পত্তি পাবে (ক) দৌহিত্র (খ) পিতা (গ) ভাই (প্রথমে সহোদর পরে বৈমাত্রেয় ভাই) (ঘ) মাতা (ঙ) ভ্রাতুষ্পুত্র (চ) ভাতুষ্পুত্রের পুত্র (ছ) ভাগিনেয় (জ) পিতামহ এবং (ঝ) পিতামহী এভাবে ৫৩ জন।
(১২) মূলত প্রথম বিশ জনের মধ্যেই উত্তরাধিকারীত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে।
(১৩) হিন্দু আইনে ত্যাজ্য করে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোন বিধান নেই ।
(১৪) মৃতের হত্যাকারী পুত্র এবং হত্যাকারী পুত্রের পুত্র সম্পত্তি পাবে না।
(১৫) সপিণ্ডের তালিকায় বোন এর নাম না থাকায় বোন উত্তরাধিকারী হবে না।
(১৬) হিন্দু আইন শুধু ভারত উপমহাদেশের হিন্দুদের জন্য প্রযোজ্য।
(১৭) দান দায়ভাগ মতে একজন হিন্দু যাদের ভরণ-পোষণের জন্য আইনত বাধ্য তাদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা রেখে সমুদয় সম্পত্তি দান করতে পারেন।
(১৮) দায়ভাগ মতে পিতার মৃত্যুতে পুত্র সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারীত্ব লাভ করে।
(১৯) উইল দানের মতই যাদের ভরণ-পোষণের বাধ্যবাধকতা আছে তাদের জন্য ব্যবস্থা রেখে একজন হিন্দু তার বাকি সম্পত্তি অপরকে উইল করতে পারেন।
(২০) ভরণ-পোষণ একজন হিন্দু তার বৃদ্ধ পিতা-মাতা, সতী স্ত্রী, নাবালক সন্তান, অবিবাহিতা কন্যার ভরণ-পোষণে বাধ্য ।
উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী একজন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি যারা ভোগ করার অধিকারী তারাই উত্তরাধিকার। বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করে। এখানে কেবল মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ উত্তরাধিকার আইন নিয়ে আলোচনা করা হলো
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (সুন্নী)
বাংলাদেশে ‘মুসলিম পরিবারিক আইন, ১৯৬১ অনুযায়ী বিয়ে, দেনমোহর, তালাক, হেবা, ওয়াকফ, উইল, খোরপোষ, অভিভাকত্ব উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
মুসলিম আইনের উৎস
(ক) আল-কোরআন, (খ) হাদীস বা সুন্নাহ, (গ) ইজমা, এবং (ঘ) কিয়াস আল-কোরআন হচ্ছে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের মূল উৎস। পবিত্র কোরআনের সূরা আল নিসার ১১, ১২ ও ১৭৬ নং আয়াতে মুসলিম ফারায়েজ সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে। এ ছাড়া হাদিস, ইজমা ও কিয়াস মুসলিম আইনের অন্যতম উৎস।
উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি
কোন মুসলমানের মৃত্যুর পর তার ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে (ক) মৃত্যুশয্যাকালীন ও দাফন-কাফন খরচ (খ) মৃত্যুর তিন মাস পূর্ব পর্যন্ত সেবা-শুশ্রূষার খরচ, (গ) ঋণ পরিশোধ, (খ) উইল/দান পরিশোধের পর যে সম্পত্তি থাকে তাই তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হবে।
উত্তরাধিকার বা ওয়ারিশ
মুসলিম আইনে ওয়ারিশ তিন ধরনের
(১) অংশীদারঃ
পবিত্র কোরআনে যাদের অংশ নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে তারাই অংশীদার। যেমন-পিতা, মাতা, দাদা, দাদী, স্বামী/স্ত্রী (৫ জন)।
(২) রেসিডুয়ারী (আসাবা)/পরিত্যক্ত অংশভোগীঃ
এরা নির্ধারিত অংশ পায় না। অংশীদারদের মধ্যে নির্ধারিত অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি এরা পাবে। যেমন পুত্র, ভাই, চাচাত ভাই, ভাইয়ের পুত্র (৪ জন)।
(৩) দূর সম্পর্কের আত্মীয়ঃ
উপরোক্ত দু’ধরনের কোনটিরই অন্তর্ভুক্ত নয় অথচ রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়। যেমন ভাগ্নি, ভাতিজি, চাচাত বোন (৩ জন) = মোট ১২ জন উত্তরাধিকার।
উত্তরাধিকার আইন
মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে সম্পদ বণ্টন (ফারায়েজ) নীতি
১। কোন মুসলমানের মৃত্যুর সাথে সাথেই তার সম্পত্তির স্বত্ব ওয়ারিশদের উপর বর্তায়
২। মৃতের রেখে যাওয়া মোট সম্পত্তিতে পূর্বে সনাতন পদ্ধতিতে ১৬ আনা বা ১ ধরে বন্টন করা হতো, আধুনিককালে ১০০০ ধরে বণ্টন করা হয় ।
৩। সমপর্যায়ের নারী পুরুষের অর্ধেক পাবে। অর্থাৎ প্রত্যেক পুত্র কন্যার দ্বিগু পাবে (ব্যতিক্রম পিতা, মাতা)।
৪ । নিকটবর্তীয় কারণে দূরবর্তী সম্পত্তি পাবে না। যেমন— পিতা বেঁচে থাকলে দাদা পাবে না।
৫। মৃত্যুকালে যার দ্বারা সম্পর্কযুক্ত তিনি বেঁচে থাকলে পরবর্তী সম্পর্কযুক্ত ব্যকি পাবে না। যেমন— পিতা থাকলে ভাই পাবে না।
৬। পুত্র না থাকলে কন্যা একজন হলে ১/২ বা ৫০০ অংশ পাবে, একাধিক হলে ২/৩ বা ৬৬৭ (সকল একত্রে) অংশ পাবে (মোট সম্পত্তি ১০০০ ধরে)।
৭ । স্বামীর সন্তান বর্তমানে স্ত্রী ১/৮ – অংশ বা ১২৫ অংশ পাবে, স্বামী নিঃসন্তান হলে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির ১/৪ বা ২৫০ অংশ পাবে (স্ত্রী একাধিক হলে সব একত্রে ঐ পরিমাণই পাবে)।
৮। স্ত্রীর সন্তান থাকলে স্বামী ১/৪ – বা ১২৫ অংশ পাবে, স্ত্রী নিঃসন্তান হলে স্বামী স্ত্রীর সম্পত্তির ১/২ – বা ৫০০ অংশ পাবে।
৯। সন্তান থাকলে পিতা ১৬৭ (১/৬) অংশ, সন্তান না থাকলে পিতা অপর শরীকের প্রাপ্য দেওয়ার পর বাকি অংশ পাবে।
১০ । সন্তান থাকলে মাতা ১৬৭ অংশ সন্তান না থাকলে ৩৩৩ বা ১/৩ অংশ পাবে। (দুই বা ততোধিক ভাইবোন থাকলে মাতার অংশ বৃদ্ধি পাবে না)
১১। স্বামী/স্ত্রী বেঁচে থাকলে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ দেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে মাতা তার ১৬৭ অংশ পাবে।
১২। পুত্র বা পিতার বর্তমানে ভাই/বোন ওয়ারিশ হয় না।
১৩। পিতা, পুত্র, কন্যা বা ভাই/বোন না থাকলে দূরবর্তী আত্মীয়গণ সম্পত্তি পাবে।
১৪ । মৃত ব্যক্তি নিঃসন্তান হলে পিতা ৬৬৭ অংশ মাতা ৩৩৩ অংশ পাবে ।
১৫। পিতা, মাতা ও সন্তান না থাকলে বোন থাকলে সে ৫০০ অংশ পাবে, বোন একাধিক হলে একত্রে ৬৬৭ অংশ, ভাই ও বোন থাকলে, ভাই বোনের দ্বিগুণ পাবে।
১৬। নিঃসন্তান বোনের সম্পত্তি ভাই পাবে।
১৭। প্রাথমিক উত্তরাধিকারী ৫ জন, যথা (ক) সন্তান (খ) পিতা (গ) মাতা (ঘ) স্বামী এবং (ঙ) স্ত্রী— এরা কখনো বঞ্চিত হবে না।
১৮। গৰ্ভস্থ সন্তান জীবিত গণ্যে উত্তরাধিকারী হবে। তাই গর্ভের সন্তানকে পুত্র গণ্য করে বা তার জন্মের পরে সম্পদ বণ্টন করতে হবে।
১৯। প্রাপ্য সম্পত্তির আনুপাতিক হারে মৃতের দেনা (যদি থাকে) ওয়ারিশদের পরিশোধ করতে হবে।
২০। নপুংসক সন্তানকে মেয়ে গণ্যে সম্পদ বন্টন করতে হবে।
২১। যার সম্পত্তি বণ্টিত হচ্ছে তার মৃত্যুর পূর্বে তার কোন পুত্র/কন্যা মারা গেলে মৃত পুত্র/কন্যার কোন সন্তান বর্তমান থাকলে সে সন্তান ঐ পরিমাণ সম্পত্তি পাবে যা ) তার/তাদের পিতা/মাতা জীবিত থাকলে পেত । (৪ ধারা মুঃ পাঃ আঃ ৬১)
২৪ । বৈপিত্রেয় ভাই একজন হলে ১৬৭ অংশ, একাধিক হলে একত্রে ৩৩৩ অংশ পাবে।
২৫। মৃত ব্যক্তির পুত্র/কন্যা, পৌত্র, বা দাদা বর্তমান থাকলে বৈপিত্রেয় বৈমাত্রেয় ভাই/বোন কোন সম্পত্তি পাবে না।
২৬। কোন উত্তরাধিকারী সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে যদি (ক) যার সম্পত্তি তাকে হত্যা করে, অথবা (খ) ভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করে।
২৭। মা’র সম্পত্তিতে কন্যা পিতার সম্পত্তির ন্যায় অংশ পাবে।
উত্তরাধিকার আইন
ফারায়েজ অনুযায়ী ১২ জন অংশীদার যেভাবে সম্পত্তি পাবে
১। পিতা :
(ক) মৃতের পুত্র/পুত্রের পুত্র বা তার নিম্নে কেহ থাকলে পিতা পাবে ১৬৭ অংশ ।
(খ) পুত্র না থাকলে কন্যা বা তার নিম্নের কেউ থাকলে পিতা ১৬৭ অংশ এবং আসাবা হিসাবে সম্পত্তি পাবে।
(গ) মৃতের পুত্র, কন্যা বা তার নিম্নে কেউ না থাকলে পিতা আসাবা/রেসিডুয়ারী হবে।
২। দাদাঃ
দাদা উপরে বর্ণিত ‘পিতার ন্যায় সম্পত্তির অংশ পাবে, তবে পিতা জীবিত থাকলে দাদা কোন সম্পত্তি পাবে না। পিতার অবর্তমানেই কেবল পিতার উল্লিখিত তিন অবস্থায় দাদা সম্পত্তি পাবে।
ব্যতিক্রমঃ
(ক) পিতা থাকলে দাদী অংশ পাবে না, কিন্তু পিতা না থাকলে এবং দাদা থাকলে দাদার সঙ্গে দাদী অংশ পাবে।
(খ) মাতা, পিতা এবং স্বামী/স্ত্রী রেখে কেউ মারা গেলে স্বামীর বা স্ত্রীর অংশ দেওয়ার পর বাকি সম্পত্তির ৩৩৩ মাতা এবং ৬৬৭ অংশ আসাবা হিসেবে পিতা পাবে।
৩। স্বামীঃ
(ক) সন্তান বা সন্তানের বা তার নিম্নে কেউ না থাকলে ৫০০ অংশ।
(খ) সস্তান বা সন্তানের সন্তান থাকলে পাবে ২৫০ অংশ।
৪। স্ত্রীঃ
(ক) সন্তান/সন্তানের পুত্র/যতই নিম্নতম হোক না থাকলে পাবে ২৫০অংশ।
মুসলিম সুন্নী আইনের বিধান মতে সম্পত্তির অংশীদারদের অংশ বণ্টন করে দেওয়ার পর যদি দেখা যায় যে বণ্টিত অংশের সমষ্টি মোট সম্পত্তির এককের চেয়ে বেশি। তখন বণ্টিত অংশ আনুপাতিক হারে কমিয়ে দেয়ার নিয়মকে বলে আউল নীতি ।
রাদ্দ (ফেরত নীতি)ঃ
অংশীদারদের অংশ দেয়ার পর সম্পত্তি উদ্বৃত্ত থাকলে তা আনুপাতিক হারে অংশীদারদের মধ্যে পুনরায় বণ্টন করার নিয়মকে বলে রাদ্দ বা ফেরত নীতি ।
নিম্নে আউল এবং রাদ্দের ভিত্তিতে সম্পত্তি আনুপাতিক হারে হ্রাস ও বৃদ্ধি করার কিছু সহজ পদ্ধতি তুলে ধরা হল
আউল নীতিতে সম্পত্তি আনুপাতিক হারে হ্রাস করার নিয়ম
পরম করুণাময় আল্লাহর নাম স্মরণ রেখে অত্র মোক্তারনামা দলিলের বর্ণনা শুরু করছি। যেহেতু আমি মোক্তারনামা দাতা (Principal) নিম্ন তফসিলভুক্ত সম্পত্তি/ডেইরী ফার্ম হতে দূরে বসবাস করছি এবং আমার শারিরীক অসুস্থতার জন্য স্বীয় শাসন সংরক্ষণে অসমর্থ হয়েছি, সেহেতু আমি দাতা আপনি গ্রহীতা আমার পরম হিতৈষী জেনে নিম্নলিখিত শর্তাবলীতে অন্য ইং তারিখে সর্বজন জ্ঞাতসারে আমার স্বত্ত্বাধীন নিম্ন তফসিলভুক্ত সম্পত্তির / ডেইরী ফার্মে শাসন সংরক্ষণের নিমিত্তে আপনাকে আমার বৈধ প্রতিনিধি বা মোক্তার (Attorney) নিয়োগ করলাম।
(২) আপনি তফসিলভুক্ত সম্পত্তি/ডেইরী ফার্ম সম্পর্কিত দাবি, আদায়, গ্রহণ এবং এ সম্পর্কে ব্যক্তি, কোম্পানী, সমিতি, সংস্থা, কর্তৃপক্ষ বা সরকার বা অন্য কোন সংস্থার দাবি, ক্ষতিপূরণ, দুর্ঘটনা ইত্যাদি বিষয়ে যোগাযোগ রক্ষা করবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।
(৩) আপনি মিউনিসিপ্যালিটি, উন্নয়ন সংস্থা, বিমান, চেম্বার অব কমার্স, ট্রেজারী, রাজস্ব অফিস, সেটেলমেন্ট অফিস, দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালত আপিল আদালত আয়কর কর্তৃপক্ষ ইত্যাদিতে প্রয়োজনবোধে উপস্থিত হবেন এবং আমাকে প্রতিনিধিত্ব করবেন।
(৪) আপনি তফসিলভুক্ত সম্পত্তি/ডেইরী ফার্মের উন্নয়নকল্পে সম্পত্তি দান, বিক্রয় বন্ধক ইত্যাদিরূপে হস্তান্তর করতে পারবেন এবং এজন্য দলিলাদি সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করতে পারবেন।
(৫) তফসিলভুক্ত সম্পত্তি রক্ষণার্থে মামলা-মোকদ্দমা মোকাবেলা করতে এবং এজন্য এডভোকেট নিয়োগ করতে এবং তার ফিসাদি নির্বাহ করতে পারবেন।
(৬) মামলা-মোকদ্দমার আরজি জবাব, দরখাস্তে ও ওকালতনামায় স্বাক্ষর করতে পারবেন এবং আপনি মামলা আপোস, নিষ্পত্তি, পরিচালনা, প্রত্যাহার এ সম্পর্কে যা ভাল মনে করবেন তাই করতে পারবেন।
(৭) আপনি তফসিলভুক্ত সম্পত্তি/ডেইরী ফার্ম সংক্রান্ত বিষয়ে বিল, মানি অর্ডার, চেক, ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার, বণ্ড বা অন্য যে কোন জামানত গ্রহণ ও প্রদান করতে পারবেন।
আমি রহিম মিয়া নিম্ন তফসিলভুক্ত সম্পত্তি/ ডেইরী ফার্মের স্বত্বাধিকারী (আপনি গ্রহীতা) কর্তৃক সম্পাদিত উপর্যুক্ত শর্তাধীনে যাবতীয় কার্যাদি অত্র মোক্তারনামা দলিল দ্বারা অনুমোদন ও বহাল করলাম এবং এ মর্মে স্বেচ্ছায় ও স্বজ্ঞানে উপস্থিত নিম্নোক্ত সাক্ষীগণের সম্মুখে অত্র মোক্তারনামা পাঠ করে ও এর মর্ম অবগত হয়ে নিজে স্বাক্ষরে সম্পাদন করে দিলাম।
একটি মোক্তারনামা দলিলের নমুনা
ইতি তারিখ… ইংরেজি …. বাংলা সনের….. বৈশাখ, ইংরেজি ……. সনের …… এপ্রিল সকাল ১১:৩০ মিঃ।
তফসিল বর্ণনা
সম্পত্তি/ডেইরী ফার্মের বিবরণ: …………….
সাক্ষীদের পূর্ণ স্বাক্ষর সনাক্তকারীর স্বাক্ষর দাতার স্বাক্ষর
স্থান ও তারিখ
ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা সম্পত্তি–সংক্রান্ত নানা আইনি কাজে অনেক সময় নিজে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে জমিজমা কেনাবেচা, রেজিস্ট্রেশন, মামলা পরিচালনা বা প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত কাউকে ক্ষমতা প্রদান করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রয়োজন থেকেই মোক্তারনামা বা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে মোক্তারনামা একটি সংবেদনশীল ও পূর্ণাঙ্গ আইনি দলিল হওয়ায় এটি যথাযথ নিয়ম, শর্ত ও আইন মেনে সম্পাদন করা অত্যন্ত জরুরি। ভুল বা অসতর্কতার কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই মোক্তারনামা কী, এর প্রকারভেদ, শর্তাবলী, রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্য করণীয়, রি-স্ট্যাম্পিং এবং বাতিলের নিয়ম—এসব বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। এই আলোচনায় মোক্তারনামা বা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি যেভাবে আইনসম্মতভাবে করতে হয়, তা ধাপে ধাপে তুলে ধরা হয়েছে।
মোক্তারনামা বা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি যেভাবে করতে হয়
মোক্তারনামা বা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি যেভাবে করতে হয়
মোক্তারনামা বা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি একটি পরিপূর্ণ আইনী দলিল। স্ট্যাম্প এ্যাক্ট, ১৮৯৯ এর ২(২১) উপ-ধারা অনুসারে যে ‘দলিল’ দিয়ে কোন ব্যক্তিকে অন্য কোন ব্যক্তির পক্ষে হাজির হয়ে কার্য সম্পাদন বা কোন ডিক্রি/রেজিস্ট্রি সম্পাদন, তত্ত্বাবধান ইত্যাদি বিষয়ক যাবতীয় কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষমতা দেয়া হয় তাকে মোক্তারনামা বলে।
সাধারণত স্থাবর সম্পত্তি তথা জমিজমা দান, বিক্রয়, হস্তান্তর, রক্ষণাবেক্ষণ, বন্ধক রাখা, ক্ষণ গ্রহণ, খাজনা প্রদান ইত্যাদি কাজে মোক্তার বা অ্যাটর্নি বা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়। তবে অস্থাবর সম্পত্তির বিষয়েও মোক্তার নিয়োগ করা যায়।
পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি
পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দু’প্রকার, যথা
(ক) জেনারেল পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি,
(খ) স্পেশাল পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি।
যে মোক্তারনামায় মোক্তারদাতার পক্ষে জমি-জমা ক্রয়, বিক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ, চুক্তিপত্র করা, মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা করা সহ যাবতীয় কাজের ক্ষমতা মোক্তারকে দেয়া হয় তাকে জেনারেল পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি বলা হয়।
অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট বা কোন বিশেষ কাজের ক্ষমতা মোক্তারকে দিয়ে তৈরী মোক্তারনামাকে বলে স্পেশাল পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি ।
মোক্তারনামা বা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি যেভাবে করতে হয়
পাওয়ার অফ অ্যাটর্নির শর্তাবলী
(১) মোক্তারনামা নোটারী পাবলিক, ম্যাজিস্ট্রেট বা বিদেশে সম্পাদিত হলে তা দূতাবাসের প্রতিনিধির সম্মুখে সম্পাদন (সহি) করতে হবে এবং তদিক/সত্যায়ন করতে হবে;
(২) মোক্তারনামা লিখিত দলিল হতে হবে;
(৩) মোক্তারনামা যথাযথ স্ট্যাম্পযুক্ত হতে হবে;
(৪) মোক্তারনামা দাতা (Principal) কর্তৃক মোক্তার (Attorney) কে ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।
মোক্তারনামা বা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি যেভাবে করতে হয়
পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি রেজিস্ট্রিকরণ
(ক) মোক্তার দাতা তার পক্ষে কাউকে রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩২ ধারা মতে দলিল সম্পাদন ও দাখিল করার জন্য মোক্তার নিযুক্ত করে যে মোক্তারনামা তৈরি করেন তা অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে (রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩৩ ধারা)।
(খ) মোক্তারনামা দাতার (Principal) সম্পত্তি যেখানেই থাকুক দাতা যেখানে বসবাস করেন সে জেলার রেজিস্ট্রার বা সাব-রেজিস্ট্রার এর সম্মুখে মোক্তারনামা সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করতে হবে।
(গ) মোক্তারনামা সম্পাদনকালে দাতা বিদেশে বসবাসরত থেকে থাকলে তাকে নোটারী পাবলিক, আদালতের বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট বা বাংলাদেশ দূতাবাসের বাণিজ্যদূত বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির সম্মুখে মোক্তারনামা সম্পাদন করতে হবে এবং তার দ্বারা মোক্তারনামাটি প্রত্যয়ন করাতে হবে।
(ঘ) দলিল দাতা দলিল নিজে সম্পাদন করে তা রেজিস্ট্রি অফিসে দাখিল করার জন্য ক্ষমতা দিয়ে মোক্তারনামা তৈরি করলে এরূপ মোক্তারনামা শুধু তসদিক বা সত্যায়ন করলেই চলবে। এরূপ মোক্তারনামা রেজিস্ট্রি করতে হবে না।
(ঙ) যে সব মোক্তারনামা রেজিস্ট্রি করতে হবে তা অবশ্যই সম্পাদনের ৪ মাসের মন্ত্রে দাখিল করতে হবে।
(চ) রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩৩ (১) ধারায় যে সব ব্যক্তিকে রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়া হতে রেহাই দেয়া হয়েছে তারা বাড়িতে বা জেলে বসে মোক্তারনামা সম্পাদন করতে পারবেন ।
মোক্তারনামা নিয়মিতকরণ বা রি-স্ট্যাম্পিং
বাংলাদেশের বাইরে অবস্থানরত কোন ব্যক্তি মোক্তারনামা করতে চাইলে তাকে মোক্তারনামাটি রেজিস্ট্রেশন এ্যাক্টের ৩৩(গ) ধারা মতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দ্বারা প্রত্যয়ন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে সত্যায়ন করে নিতে হবে। এরপর দলিলটি দিন মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের নিকট রি-স্ট্যাম্পিং এর জন্য দাখিল করতে হবে।
জেলা প্রশাসক সবকিছু যথাযথ পেলে স্ট্যাম্প এ্যাক্টের ১৮ ধারা মতে বিশেষ আঠাযুক্ত (Adhesive) স্ট্যাম্প লাগিয়ে তা বাতিল করে নিয়মিত বা রি-স্ট্যাম্পিং করে দিবেন। পাওয়ার দলিল সম্পাদনের দিন মাসের মধ্যে জেলা প্রশাসকের নিকট দাখিল করতে না পারলে স্ট্যাম্প এ্যাক্টের ৩৩ ধারা মতে সাধারণ ফিসের দশ গুণ বেশী ফিস দিয়ে তা নিয়মিতকরণ করা যাবে।
মোক্তারনামা বাতিলের পদ্ধতি
(ক) মোক্তারনামা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য করা হলে মেয়াদ শেষে তা বাতিল বলে গণ্য হবে;
(খ) মোক্তারনামা নির্দিষ্ট কোন কাজের জন্য করা হলে ঐ কাজ সমাপ্তিতে তা বাতিল বলে গণ্য হবে
(গ) যৌথ ক্ষমতার মোক্তারনামার পক্ষদের একজনের মৃত্যুতে তা বাতিল বলে গণ্য হবে:
(ঘ) মোক্তারনামা দাতা কোন মোক্তারনামা বাতিল করতে ইচ্ছুক হলে যে রেজিস্ট্রি অফিসে তা তসদিক করা হয়েছিল সে স্থানের জেলা রেজিস্ট্রারের (ডি. আর.) বরাবরে মোক্তারনামা রদের আবেদন করতে হবে। পূর্বকৃত মোক্তারনামাটি বিনষ্ট না হয়ে থাকলে আবেদনের সঙ্গে সেটিও দাখিল করতে হবে।
এতে তিনি “রদ করা হলো” কথাটি লিখে দিবেন এবং সে মোতাবেক রেজিস্ট্রার সংশোধন করবেন। রেজিস্ট্রারিং অফিসার মোক্তারনামা বাতিলের আবেদন পাবার পর তাঁর জেলার সকল রেজিস্ট্রি অফিসে বা অন্য কোন জেলা সদর অফিসকে বিষয়টি নোটিসের মাধ্যমে জানিয়ে দেবেন। নোটিস জারীর ডাকটিকেটের খরচ আবেদনকারী বহন করবেন,
(ঙ) তবে স্বার্থের সাথে যুক্ত মোক্তারনামা স্বার্থপূর্ণ বা পরিত্যক্ত না হওয়া পর্যন্ত বাতিল করা যায় না। (মোক্তারনামা আইনের ৩ ধারা)
আজকের দ্রুতগতির জীবনে অনেকেই নিজের সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও পরকালের জন্য স্থায়ী পুণ্য অর্জনের কথা ভাবেন। এমন একটি শক্তিশালী ও কার্যকরী উপায় হলো ওয়াক্ফ। ওয়াক্ফ শুধু একটি সম্পত্তি দানের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ইসলামী শরিয়াহ অনুসারে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদকে স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করার এক মহৎ আমল, যা ইহকালে সমাজের কল্যাণ এবং পরকালে অবিরাম সওয়াবের উৎস হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে ওয়াক্ফ অধ্যাদেশ, ১৯৬২ এর মাধ্যমে ওয়াক্ফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণের একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো রয়েছে। এই আইন অনুসারে যেকোনো মুসলমান (এমনকি অমুসলিমও নির্দিষ্ট শর্তে) ধর্মীয়, পবিত্র বা দাতব্য উদ্দেশ্যে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি চিরস্থায়ীভাবে উৎসর্গ করতে পারেন। এর ফলে মসজিদ-মাদ্রাসা, ঈদগাহ, কবরস্থান, হজ্জ সহায়তা, গরিবদের সাহায্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহ এবং এমনকি ওয়াকিফের পরিবার-বংশধরদের ভরণপোষণের ব্যবস্থাও করা যায়—যাকে ওয়াক্ফ লিল্লাহ ও ওয়াক্ফ আল-আওলাদ নামে চিহ্নিত করা হয়।
অনেকে মনে করেন ওয়াক্ফ শুধু জমি-বাড়ি দানের বিষয়, কিন্তু বাস্তবে এর মাধ্যমে সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। তবে সঠিকভাবে ওয়াক্ফ করতে হলে এর শর্ত, উপাদান, রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া, ওয়াক্ফ প্রশাসকের ভূমিকা, মোতায়াল্লীর দায়িত্ব, তালিকাভুক্তি, হস্তান্তরের নিয়মসহ বিভিন্ন আইনি দিক জানা অত্যন্ত জরুরি—যাতে পরবর্তীতে কোনো বিরোধ বা অপব্যবহার না হয়।
এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করবো—ওয়াক্ফ কেন করবেন, কীভাবে করবেন, এর প্রকারভেদ, উদ্দেশ্য, শর্তাবলী, আইনি প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর ব্যবস্থাপনা—যাতে আপনি সচেতন ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ওয়াক্ফ কেন, কিভাবে করবেন
ওয়াক্ফ কেন, কিভাবে করবেন
সরকার ওয়াক্ফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে ১৯৬২ সালে ওয়াক্ফ অধ্যাদেশ, ১৯৬২ জারী করে।
ওয়াকৃষ্ণ বলতে অধ্যাদেশের ২ ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘কোন মুসলমান কর্তৃক ধর্মীয়, পবিত্র বা দাতব্য কাজের উদ্দেশ্যে তার স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করাকে বুঝায়।’ তবে কোন অমুসলিমও একই উদ্দেশ্যে সম্পত্তি উৎসর্গ করতে পারেন।
ওয়াকফঃ
যিনি সম্পত্তি উৎসর্গ করে তাকে বলে ‘ওয়াকফ’।
ওয়াক্ফ দুই প্রকারঃ
(১) ওয়াকফ লিল্লাহ এবং
(২) ওয়াক্ফ আল-আওলাদ।
ওয়াক্ফ লিল্লাহ :
ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে অর্থাৎ পরকালে শান্তির আশায় পুণ্য অর্জন এবং ইহকালে জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে যে ওয়াক্ফ করা হয় তাকে বলে “ওয়াকফ লিল্লাহ’।
ওয়াকফ আল-আওলাদঃ
কোন ব্যক্তি তার সম্পত্তি ওয়াকফ করে এর আয় হতে আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে তার বংশধরদের/পরিবারের সদস্যদের এমনকি তার নিজের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করতে পারেন। এরূপ ওয়াক্ফই হলো ‘ওয়াক্ফ আল- আওলাদ’। ওয়াকিফ যদি সম্পূর্ণ সম্পত্তি এরূপ ভরণ-পোষণের লক্ষ্যে উৎসর্গ করে, তবে ওয়াকিফ বা তার বংশধরগণ নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত ওয়াকফ সম্পত্তি দাতব্য/ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হবে না। তাদের মৃত্যুর পর ওয়াক্ফ সম্পত্তির আয় দাতব্য বা ধর্মীয় কাজে ব্যয়িত হবে। আর আংশিক ধর্মীয়/দাতব্য এবং আংশিক ভরণ-পোষণ এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে ওয়াকফ করলে ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তির আয় সেভাবেই ব্যয়িত হবে।
ওয়াক্ফ কেন, কিভাবে করবেন
যে সব উদ্দেশ্যে ওয়াক্ফ করা যায়ঃ
মক্কা শরীফে হাজীদের জন্য ‘বোরাত’ (বোর্ডিং হাউজ) নির্মাণ, ঈদগাহে মঞ্জুরী দান, মাদ্রাসা, খানকা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর ব্যয় নির্বাহ, হজ্জ পালনে সাহায্য করা, গরীবদের সাহায্য করা। ওয়াকিফ ও তার বংশধরদের ভরণ- পোষণ ইত্যাদি উদ্দেশ্যে সম্পত্তি উৎসর্গ করা যায়।
ওয়াফের উপাদান
(ক) ওয়াকফের উদ্দেশ্যে সম্পত্তি উৎসর্গ করতে হবে,
(খ) ওয়াকফ ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে হতে হবে,
(গ) ওয়াফের উদ্দেশ্যে সম্পত্তি উৎসর্গ অবশ্যই চিরস্থায়ী হতে হবে;
(ঘ) ওয়াকিফকে উৎসর্গীকৃত সম্পত্তির বৈধ মালিক হতে হবে;
(ঙ) ওয়াকিফকে প্রাপ্তবয়স্ক এবং সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হতে হবে;
(চ) ওয়াকফ শর্তমুক্ত হতে হবে।
ওয়াফের বিষয়বস্তুঃ
স্থাবর বা অস্থাবর উভয় ধরনের সম্পত্তিই ওয়াকফ করা যায়। অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে কোম্পানীর শেয়ার, সরকারী ঋণপত্র, নগদ অর্থ ইত্যাদি। ওয়াকফ প্রশাসক সরকার ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে অধ্যাদেশের ৭ ধারা অনুসারে ‘ওয়াক্ফ প্রশাসক নিয়োগ করে থাকেন। যিনি ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
ওয়াক্ফ প্রশাসকের দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ
(ক) ওয়াক্ফ প্রশাসক ওয়াকফ ও এর তহবিল পরিচালনার জন্য ১০ সদস্য বিশিষ্ট। একটি কমিটি গঠন করেন। তিনি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। (ধারা- ১৯, ২০)
(খ) প্রশাসক সরকারের অনুমতিক্রমে এবং ওয়াফের কল্যাণে/উন্নতিকল্পে ওয়াকফকৃত সম্পত্তি বা এর অংশবিশেষ যে কোন রূপ হস্তান্তর করতে পারেন। (ধারা- (৩৩)
(গ) প্রশাসক মোতায়াল্লীকে উপযুক্ত কারণ সাপেক্ষে অপসারণ করতে পারেন ।(ধারা-৩২)
(ঘ) প্রশাসক তার প্রতিনিধির মাধ্যমে বা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। (ধারা-৩৪ ও ৩৬) (বাস্তবে জেলাপ্রশাসকই ওয়াক্ফ প্রশাসকের পক্ষে দায়িত্ব পালন করে থাকেন ।
(ঙ) ওয়াকফ প্রশাসকের কোন আদেশে কেউ সংক্ষুব্ধ (ক্ষতিগ্রস্ত) হলে তিনি সংশ্লিষ্ট জেলা জজের আদালতে আপিল করতে পারেন । (ধারা-৩৫)
মোতায়াল্লী নিয়োগ
ওয়াকফ পরিচালনার জন্য গঠিত কমিটির সদস্য সচিবের বা ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবস্থাপকের ভূমিকায় যিনি থাকেন তাকেই বলে মোতায়াল্লী। মোতায়াল্লী সাবালক ও মানসিকভাবে সুস্থ হবেন।
ওয়াক্ফ কেন, কিভাবে করবেন
মোতায়াল্লী নিয়োগ প্রক্রিয়া নিম্নরূপ :
(১) ওয়াকিফ নিজে মোতায়াল্লী হতে পারেন।
(২) ওয়াকিফ সম্পত্তির সুবিধাভোগী (Beneficiary) ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক মনোনীত হতে পারেন।
(৩) ওয়াকিফের মৃত্যুকালীন ঘোষণা দ্বারাও কোন ব্যক্তি মোতায়ারী হতে পারেন।
(৪) ওয়াকিফের কার্যকারক (Executor) কর্তৃক মনোনীত হতে পারেন।
(৫) আধ্যাত্মিক কার্যক্রম না থাকলে মহিলাও মোতায়ারী নিযুক্ত হতে পারেন।
(৬) প্রশাসক মোতায়ারী নিয়োগ করতে পারেন, তবে এ মোতায়ারী নিয়ে কোন সমস্যা হলে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ও (দেওয়ানী) মোজায়ারী নিয়োগ দিতে পারেন। (ধারা-৩৪)
মোতায়াল্লীর দায়িত্ব ও কর্তব্য
(১) ওয়াক্ফ সম্পত্তি ‘প্রশাসকের দপ্তরে (ঢাকার ইস্কাটনে) তালিকাভুক্ত করা।
(২) প্রতি ১৫ই জুলাই তারিখের মধ্যে পূর্ববর্তী অর্থ বছরের আয় ও বায়ের হিসেব প্রশাসকের নিকট পেশ করা।
(৩) আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষার (Audit) ব্যবস্থা করা।
(৪) ওয়াক্ফ সম্পত্তি হস্তান্তর করার প্রয়োজন হলে প্রশাসকের পূর্বানুমতি নেয়া।
(৫) ওয়াক্ফ সম্পত্তির আয়ের ৫% বার্ষিক চাঁদা প্রশাসকের দপ্তরে প্রদান করা।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এর বিধান মতে স্থাবর সম্পত্তির (১০০ টাকার বেশি মূল্য হলেই) দলিল রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক। তবে অস্থাবর সম্পত্তির ওয়াক্ফ মৌখিকভাবেও করা যায়।
ওয়াক্ফ প্রত্যাহার :
অছিয়তের (উইল) মাধ্যমে ওয়াকফ সৃষ্টি হয়ে থাকলে ওয়াকিফ তার মৃত্যুর পূর্বে যে কোন সময় তা প্রত্যাহার করতে পারেন। অছিয়ত ভিন্ন সাধারণ ওয়াফের ক্ষেত্রে ওয়াকিফ ওয়াক্ফ প্রত্যাহার কতে পারেন না।
ওয়াকফ করা বাধ্যতামূলকঃ
মোহামেডানস্ ল অনুসারে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ঈদগাহ, কবরস্থান, ইমামবাড়া, মাদ্রাসা ও মসজিদের জন্য জমি দান করলে তা অবশ্যই ওয়াক্ফ করতে হবে।
ওয়াক্ফ সম্পত্তি হস্তান্তরঃ
মসজিদ, মাদ্রাসার নামে অনেকেই জমি দান করেন। এ সকল জমি অনেক সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি বিভিন্ন কারণে বিক্রি করে থাকেন। বাস্তবে ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি করতে হলে ওয়াক্ফ প্রশাসকের অনুমতি নিতে হবে। অন্যথায় ঐ বিক্রি শুদ্ধ হবে না এবং তাতে ক্রেতার স্বত্ব সৃষ্টি হবে না। কারণ ওয়াকফ সম্পত্তির মালিক ওয়াক্ফ প্রশাসক। বিবেচ্য জমি মসজিদ-মাদ্রাসার রবর্তী হওয়ার কারণে ঐ জমি বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানের নিকটবর্তী কোন জমি কেনার জন্য ওয়াকফ প্রশাসক এরূপ বেচা-কেনার অনুমতি দিয়ে থাকেন।
কমিটি নিয়ে মতবিরোধে করণীয়ঃ
সম্পত্তি কোন প্রতিষ্ঠানের বরাবরে ওয়াকফ করা হলেও প্রায়ই তা ওয়াকফ প্রশাসকের দপ্তরে তালিকাভুক্ত করা হয় না। তাছাড়া এসকল সম্পত্তির পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়েও অনেক সময় দেখা দেয় দ্বন্দ্ব ও বিরোধ। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে যে পক্ষ বিবেচ্য সম্পত্তি ওয়াক্ফ প্রশাসকের দপ্তরে তালিকাভুক্তির জন্য আগে যাবে সে পক্ষ ওয়াক্ফ প্রশাসক কর্তৃক কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। আর পূর্বেই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এমন ওয়াকফ সম্পত্তি/প্রতিষ্ঠানের বিরোধের নিষ্পত্তি প্রশাসকই করে থাকেন।
তালিকাভুক্তির আবেদন
যে কেউ ওয়াক্ফ সম্পত্তি তালিকাভুক্তির জন্য ওয়াক্ফ অধ্যাদেশের ৪৭ ধারা মতে নির্ধারিত ফরমে ওয়াক্ফ প্রশাসকের বরাবরে আবেদন করতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে মাজার লাভজনক হওয়ার কারণে তার তালিকাভুক্তি এড়ানোর প্রবণতা লক্ষ করা যায় । এরূপ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যে কেউ তালিকাভুক্তির আবেদন করতে পারে।
ব্যবহার ভিত্তিতে ওয়াক্ফ
অনেক সময় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা মাজারের জমিদাতা হয়ত ওয়াক্ফ করে দিয়ে যাননি কিন্তু ওয়াক্ফ আইন অনুযায়ী দীর্ঘকাল ব্যবহারের ভিত্তিতে ঐ সম্পত্তি ওয়াফ সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে থাকে। এরূপ সম্পত্তি আর নতুন করে রেজিস্ট্রির প্রয়োজন হয়। না, কেবল ওয়াক্ফ প্রশাসকের দপ্তরে তালিকাভুক্ত করতে হয় ।
দেবোত্তর সম্পত্তি
হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোকজন মন্দিরের দেবতার উদ্দেশে পুণ্য অর্জনের লক্ষ্যে সম্পত্তি উৎসর্গ করলে তাকে বলে দেবোত্তর সম্পত্তি। দেবোত্তর সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ককে বলে ‘সেবাইত’। সেবাইত এরূপ সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন না।
দেবোত্তর সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ :
দেবোত্তর সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ে একটি ‘দেবোত্তর সম্পত্তি সেল’ গঠন করা হয়েছে। উক্ত সেল থেকে এরূপ সম্পত্তির সার্বিক তত্ত্বাবধান করা হয়।
Law Class Online, Free Online Law Courses, Law Classes in High School, Law Classes in College, International Law Class